সময়ের সাথে সাথে বিশ্বরাজনীতির দৃশ্যপট যে কত দ্রুত রং বদলায়, তার এক নিখুঁত ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হলো অ্যাডলফ হিটলারের লেখা ‘মেইন কাম্ফ’ বইটি। মাত্র বছরখানেক আগে, হার্স্ট অ্যান্ড ব্ল্যাকেট প্রকাশনী থেকে এই বইয়ের যে অবিকৃত সংস্করণটি বের হয়েছিল, তা মূলত সাজানো হয়েছিল হিটলারের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি ও সমর্থনকে সামনে রেখে। সেই সংস্করণে অনুবাদকের ভূমিকা এবং টীকাগুলোর দিকে চোখ বোলালেই একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়—বইটির ভেতরের উগ্রতা ও চরমপন্থার ঝাঁজকে সুকৌশলে কমিয়ে হিটলারকে একজন গ্রহণযোগ্য ও সদয় নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এর পেছনের কারণটি বুঝতে হলে সেকালের সমাজবাস্তবতা বুঝতে হবে। সেই সময়টাতেও ইউরোপের অভিজাতদের কাছে হিটলার বেশ ‘সম্মানজনক’ একজন মানুষ। তিনি জার্মানির শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনকে চরম নিষ্ঠুরতায় গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর ঠিক এই কারণেই সমাজের বিত্তবান ও সম্পত্তির মালিক শ্রেণি হিটলারের যেকোনো অপরাধ বা বাড়াবাড়িকে হাসিমুখে ক্ষমা করে দিতে প্রস্তুত ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে সময় ডানপন্থী ও বামপন্থী—উভয় শিবিরই একটি চরম ভ্রান্ত ধারণায় বিশ্বাস করত। তারা ভাবত, হিটলারের ‘ন্যাশনাল সোশ্যালিজম’ বা নাৎসিবাদ আসলে প্রথাগত রক্ষণশীলতারই একটু উগ্র সংস্করণ মাত্র।
কিন্তু এরপরই হঠাৎ যেন জাদুর মতো দৃশ্যপট বদলে গেল! রাতারাতি পশ্চিমা বিশ্ব আবিষ্কার করল—হিটলার মোটেও কোনো সম্মানজনক ব্যক্তি নন, বরং তিনি এক ভয়ংকর ত্রাস। এই আকস্মিক বোধোদয়ের প্রভাব পড়ল বইয়ের বাজারেও। হার্স্ট অ্যান্ড ব্ল্যাকেট প্রকাশনী তড়িঘড়ি করে ‘মেইন কাম্ফ’-এর প্রচ্ছদ বদলে ফেলল এবং নতুন মোড়কে বইটি বাজারে এনে ঘোষণা দিল—এই বইয়ের যাবতীয় লভ্যাংশ রেড ক্রসকে দান করা হবে। প্রকাশকদের এই ভোলবদলের নাটকীয়তা চমকপ্রদ হলেও, বইটির পাতা উল্টালে এক ভিন্ন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়।
‘মেইন কাম্ফ’-এর ভেতরের লেখাগুলো গভীরভাবে পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন, হিটলারের মূল লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বা আদর্শে আসলে কখনোই কোনো পরিবর্তন আসেনি। এক বা দেড় বছর আগের হিটলারের বক্তব্যের সাথে যদি পনেরো বছর আগের কথাগুলো মিলিয়ে দেখা হয়, তবে তার চিন্তাধারার চরম অনমনীয়তা ও স্থবিরতা দেখে শিউরে উঠতে হয়। তার বিশ্ববীক্ষা বা পৃথিবীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির কোনো স্বাভাবিক বিকাশ ঘটেনি; বরং এটি এক বদ্ধপাগলের স্থির ও অনড় জেদ। ক্ষমতা দখলের সাময়িক কূটকৌশল তার এই মূল লক্ষ্যকে কখনোই টলাতে পারেনি।
অনেকে রুশ-জার্মান চুক্তির কথা বলে তার নীতির পরিবর্তনের কথা বলেন, কিন্তু সম্ভবত হিটলারের নিজের কাছে এই চুক্তিটি কেবলই একটি দাবার চাল—সময়সূচির সামান্য রদবদল মাত্র। ‘মেইন কাম্ফ’-এ তিনি যে মহাপরিকল্পনার ছক কষেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট: প্রথমে রাশিয়াকে গুঁড়িয়ে দেওয়া, এবং তারপর ইংল্যান্ডকে ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির চাপে তাঁকে পরিকল্পনায় একটু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে রাশিয়াকে বাগে আনা অপেক্ষাকৃত সহজ হওয়ায়, তিনি হয়তো আপাতত ইংল্যান্ডকেই আগে সামলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে ইংল্যান্ডকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরপরই যে রাশিয়ার দিকে তার রক্তচক্ষু ঘুরে যাবে—এ বিষয়ে হিটলারের নিজের মনে কোনো সংশয় নেই। শেষমেশ তিনি এতে সফল হবেন কি না, সেটি একেবারেই ভিন্ন একটি প্রশ্ন।
ধরে নেওয়া যাক, হিটলারের এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল। তাহলে আজ থেকে একশ বছর পর পৃথিবী কেমন হবে? হিটলারের কল্পনা অনুযায়ী—পৃথিবীতে ২৫ কোটি জার্মান নাগরিকের একটি অখণ্ড ও বিশাল রাষ্ট্র থাকবে। এই রাষ্ট্রের সীমানা প্রসারিত হবে একেবারে আফগানিস্তান বা তার আশেপাশের অঞ্চল পর্যন্ত। কিন্তু এটি হবে এক ভয়ংকর, মস্তিষ্কহীন ও দানবীয় সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের একমাত্র কাজ হবে রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য অবিরাম তরুণদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নতুন নতুন ‘কামানের খোরাক’ জন্ম দেওয়া।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এমন একটি বীভৎস ও দানবীয় স্বপ্নকে তিনি কীভাবে গোটা একটি জাতির হৃদয়ে গেঁথে দিতে সক্ষম হলেন?
অনেকেই খুব সহজে বলে ফেলেন যে, তার এই উত্থানের পেছনে পুঁজিপতি ও বড় শিল্পপতিদের অর্থের জোর ছিল। তারা হিটলারকে টাকা জুগিয়েছিলেন কারণ তার মাঝে তারা এমন এক রক্ষাকর্তাকে দেখেছিলেন, যে কিনা সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টদের সমূলে ধ্বংস করতে পারবে। তৎকালীন জার্মানির সত্তর লাখ বেকারের হাহাকার আর অর্থনৈতিক দুর্দশাও যেকোনো জনতুষ্টবাদী নেতার উত্থানের জন্য একেবারে আদর্শ ছিল। এই কথাগুলো আংশিক সত্য হলেও, পুরোপুরি সত্য নয়। হিটলার যদি নিজের অবিশ্বাস্য বাগ্মিতা ও সম্মোহনী ক্ষমতা দিয়ে একটি বিশাল গণআন্দোলনের জন্ম না দিতেন, তবে পুঁজিপতিরাও তাঁকে ফিরে দেখত না। তার নিজস্ব আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব না থাকলে হাজারো প্রতিদ্বন্দ্বীকে টপকে তিনি কখনোই ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে পারতেন না।
হিটলারের এই সম্মোহনী শক্তির আঁচ ‘মেইন কাম্ফ’-এর অগোছালো ও এলোমেলো বাক্যগুলোর ফাঁকেও স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। আর তার ভাষণ শুনলে তো মানুষ আক্ষরিক অর্থেই মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ত। সত্যি বলতে, এই লোকটির মধ্যে এমন কিছু একটা আছে, যা মানুষের মনের গভীরের কোনো অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নাড়া দেয়। তার ছবির দিকে তাকালেও সেটি বোঝা যায়। বিশেষ করে হার্স্ট অ্যান্ড ব্ল্যাকেটের সংস্করণের শুরুতে দেওয়া ছবিটির কথা ধরা যাক। সেখানে শুরুর দিকের ‘ব্রাউনশার্ট’ পরিহিত হিটলারের চেহারাটি বড়ই করুণ। তার দৃষ্টিতে রয়েছে প্রভুভক্ত কুকুরের মতো এক অসহায়ত্ব, যেন তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অবিচারের শিকার। তার মুখের অভিব্যক্তি অনেকটা ক্রুশবিদ্ধ যিশুর অসংখ্য ছবির মতোই, তবে একটু বেশি পৌরুষদীপ্ত।
হিটলার যে নিজেকে ঠিক এভাবেই কল্পনা করেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গোটা বিশ্বের প্রতি তার এই তীব্র আক্রোশ ও ক্ষোভের ব্যক্তিগত কারণটি হয়তো আমরা কেবল অনুমানই করতে পারি, কিন্তু তার সেই ক্ষোভটি একেবারে জীবন্ত। তিনি নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন এক মহান শহীদ বা মজলুম হিসেবে; যেন তিনি পাহাড়ের গায়ে শৃঙ্খলিত প্রমিথিউস—এক আত্মত্যাগী বীর, যিনি অসম্ভব সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একাকী লড়াই করে চলেছেন। তিনি তার এই লড়াইকে এমন এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন যে, তিনি যদি একটি সাধারণ ইঁদুরও মারেন, তবে সেটাকেও ড্রাগন বধের মতো মহিমান্বিত করে তোলার কৌশল তার জানা আছে। নেপোলিয়নের মতোই তাঁকে দেখলে মানুষের মনে হয়—এই লোকটি যেন নিয়তির বিরুদ্ধে লড়ছেন। তিনি হয়তো জিতবেন না, কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক কারণে মানুষের মনে হতে থাকে, লোকটির জেতাটাই বোধহয় উচিত! এই ধরনের ‘অবহেলিত অথচ লড়াকু’ ভাবমূর্তির আকর্ষণ মানুষের কাছে সব সময়ই প্রচণ্ড। আজকালকার অনেক জনপ্রিয় সিনেমার গল্পও তো ঠিক এই একই সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
হিটলারের এই সাফল্যের পেছনে আরও একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। তিনি আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বের ‘প্রগতিশীল’ ও ‘ভোগবাদী’ চিন্তাধারার এক বিরাট অসারতা খুব সহজেই ধরতে পেরেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পশ্চিমাদের চিন্তার মূল ধারাটি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেন—আরাম-আয়েশ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আর সব ধরনের কষ্ট থেকে দূরে থাকার বাইরে মানুষের জীবনে আর কোনো চাওয়া নেই। এই ধারণায় দেশপ্রেম, বীরত্ব বা সামরিক গুণাবলির কোনো জায়গা ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সমাজতন্ত্রী বাবা যখন দেখেন তার সন্তান খেলনা-সৈন্য নিয়ে খেলছে, তখন তিনি বিরক্ত হন। কিন্তু তিনি কখনোই ওই টিনের সেপাইয়ের কোনো আকর্ষণীয় বিকল্প তার সন্তানের হাতে তুলে দিতে পারেন না; কারণ টিনের তৈরি ‘শান্তিবাদী’ পুতুল দিয়ে তো আর খেলা জমে না!
হিটলার তার নিজের আনন্দহীন ও বিষণ্ণ মন দিয়ে অত্যন্ত গভীরভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, মানুষ শুধু আরাম, নিরাপত্তা, অল্প কাজের সময়, জন্মনিয়ন্ত্রণ বা কেবল সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে বাঁচতে চায় না। মানুষের ভেতরে এমন এক আদিম প্রবৃত্তি রয়েছে, যা অন্তত মাঝে মাঝে সংগ্রাম, কষ্ট এমনকি আত্মত্যাগও করতে চায়। যুদ্ধের দামামা, পতাকার ওড়াউড়ি আর কুচকাওয়াজের প্রতি মানুষের যে এক ধরনের আদিম আকর্ষণ রয়েছে, হিটলার সেটি নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছেন।
অর্থনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে ফ্যাসিবাদ বা নাৎসিবাদ যতই হাস্যকর বা ত্রুটিপূর্ণ হোক না কেন, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এটি প্রগতিশীলদের ভোগবাদী ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সুদৃঢ়। স্তালিনের সামরিক ধাঁচের সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই কথা খাটে। এই পরাক্রমশালী স্বৈরশাসকেরা তাঁদের দেশের মানুষের কাঁধে পাহাড়সম কষ্টের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতাকে আরও পাকাপোক্ত করেছেন। যেখানে সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদ মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছে, “এসো, আমি তোমাদের একটি সুন্দর ও আরামদায়ক জীবন দেব”; সেখানে হিটলার তার জাতিকে বলেছেন, “আমি তোমাদের কোনো আরাম দেব না; আমি তোমাদের দেব সংগ্রাম, বিপদ আর মৃত্যু।”
আর অবাক করা বিষয় হলো, এই ডাক শুনে গোটা একটি জাতি তার পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়েছে!
হয়তো একটা সময় আসবে যখন জার্মান জাতি এই অবিরাম যুদ্ধ আর রক্তপাত নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকের মতো হয়তো তারা আবারও নিজেদের মত পাল্টাবে। কারণ কয়েক বছরের নির্বিচার হত্যা, ধ্বংস আর অনাহারের পর ‘সর্বাধিক মানুষের সর্বোচ্চ সুখ’—এই স্লোগানটি শুনতে বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে “অন্তহীন বিভীষিকার চেয়ে এক ভয়াবহ সমাপ্তি শ্রেয়”—এই স্লোগানটিই যেন জয়লাভ করছে।
আজ আমরা যখন সেই মানুষটির বিরুদ্ধেই মরণপণ যুদ্ধে নেমেছি, যিনি এই ভয়াবহ দর্শনের জন্ম দিয়েছেন, তখন তার এই দর্শনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় আবেদনকে আমাদের কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। কারণ, মানুষের মনের অন্ধকার দিকটি কতখানি শক্তিশালী হতে পারে, হিটলার তার এক জীবন্ত ও ভয়ংকর প্রমাণ।


