বই থেকে বিপ্লব

কুখ্যাত তোরা কারাগার। অন্য পাঁচ-দশটা কারাগারের মতো এটা নয়। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এ কারাগারটি। যারা রাষ্ট্রের জন্য “সমস্যাজনক”, তাদেরকেই এনে রাখা হয় মূলত। মানবতাবিরোধী শত শত অপরাধ, নির্যাতন ও হত্যার দগদগে ক্ষত লেগে আছে এ কারাগারের দেয়ালে।

সময়টা ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৪ সালের মাঝামাঝি কোনো একটা সময়ে হবে। তোরা কারাগারের সবচেয়ে হাই সিকিউরিটি, সবচেয়ে ভীতিকর বিল্ডিং ‘তোরা লিমানে’ বসে কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া সাদা শার্ট-প্যান্ট পরা এক মধ্যবয়সী লোক একমনে লিখে যাচ্ছিলেন। পৃথিবীর সবটুকু মনোযোগ এক করে তিনি লিখে যাচ্ছিলেন দুনিয়া বদলে দেওয়ার আখ্যান।

৩২ ফিটের দেয়াল, চরম নির্যাতন, শেষমেশ হত্যার মাধ্যমে হালকা-পাতলা গড়নের এ লোকের কথা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে জালিম গোষ্ঠী। কিন্তু কলমের কালির জাদুকরী শক্তি হার মানিয়েছে প্রতাপশালী শাসকের কল্পনাকেও।

সেই তোরা কারাগারে লেখা কথাগুলো প্রভাবিত করেছে ১৯৭৯-এর ইরান বিপ্লবের মূল নায়ক রুহুল্লাহ খোমেনিকে। মডারেট থেকে র‍্যাডিকেল, সংস্কার থেকে বিপ্লব—মুসলিম বিশ্বের গত ১০০ বছরের মেজর আন্দোলন, সংগঠন, পরিবর্তন নানাভাবে তার লেখালেখি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। আজও বিশ্বজুড়ে নানাভাবে তার লেখা হয়ে আছে প্রাসঙ্গিক।

বলছিলাম বিখ্যাত ইসলামি তাত্ত্বিক সায়্যিদ কুতুব শহীদের কথা। তোরা কারাগারে তার বিখ্যাত বই ‘মাইলস্টোন’ (সমাজ বিপ্লবের ধারা) বইটি শুধু তার জীবনই না, ছাড়িয়ে গেছে মিশরের বিস্তৃত গণ্ডিকেও। ইখওয়ান থেকে জামাআতুল ইসলামিয়াহ, জামাআতে ইসলামী থেকে আল-কায়েদা, ঘানুশি থেকে জাওয়াহিরি—সব দিকের শত শত আন্দোলন ও ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হয়েছে এ বই থেকে।

একটি বই-ই একটা বিপ্লব—এটা হয়তো সায়্যিদ কুতুবের ‘মাইলস্টোন’-এর ব্যাপারে বলাই যায়।

শুধু ‘মাইলস্টোন’ নয়, ইতিহাসে এমন নানা লেখক ও তাদের বই আছে, যাদের লেখা ভেঙে ফেলেছে সময় ও স্থানের সব গণ্ডি। যেগুলো শুধু বিপ্লবের জন্মই দেয়নি, বরং শত বছর ধরে আলোড়িত করেছে বহু চিন্তক ও বিপ্লবীর মনকে। থমাস পেইনের ‘কমন সেন্স’, রুশোর ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’, এঙ্গেলস ও মার্কসের ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’, কিংবা হিটলারের ‘মাইন কাম্ফ’—প্রতিটা বই-ই শুধু চিন্তকদের চিন্তার খোরাক জোগায়নি, বরং মানুষকে জাগিয়ে দিয়েছে, পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে, ফেলে দিয়েছে একের পর এক সরকার।

রক্ত দিয়ে যে লেখাকে জীবন দেওয়া হয়েছে, তা তো বৃথা যাওয়ার নয়। এ কথা তো সায়্যিদ কুতুবই বলে গেছেন।

বিপ্লবের উপরে লেখা বিখ্যাত বই ‘Anatomy of Revolution’ (1938)-এ লেখক ক্রেইন ব্রিনটন চারটি বিপ্লব গবেষণা করে দেখিয়েছেন, জালিম প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, মিছিল-মিটিং—সবকিছুই মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সে তখনই ধ্বংসের মুখে পড়ে, যখন সে হারিয়ে ফেলতে থাকে তার লেজিটিমেসি। প্রভাবশালী চিন্তকরা যখন রাষ্ট্রের লেজিটিমেসি নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে, তখনই রাষ্ট্রের পতন শুরু হয়ে যায়।

চিন্তকদের সেই চিন্তাগুলোই সমাজে ছড়িয়ে পড়ে বই বা বুকলেট আকারে। হোক তা খোমেনির ক্যাসেট কিংবা লেনিনের ‘ইস্ক্রা’—বিপ্লব রাষ্ট্রে আসার আগে এসে যায় সালোনে। রক্ত ঝরার আগে ঝরে কালি। সত্যিকার বিপ্লব আসার আগেই মানুষের চিন্তায় বিপ্লবের চিত্র পরিষ্কার হয়ে যায়। সরকার পতনের আগে অসংখ্যবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে চায়ের টংগুলোতে। অনুপম উত্থানে লেগে যাক শত বছর—কিন্তু উত্থান একদিন হয়ই।

বিপ্লব হওয়ার অনেক আগে থেকেই থাকে একটা বৈপ্লবিক চিন্তা ও সাহিত্যের সংস্কৃতি। দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পরে শাণিত হয় রাজনৈতিক লাইন। নানা এক্সপেরিমেন্ট ও তর্কের পরে নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাস্তব হয়ে ধরা দেয় মানবমনে। বই সমাজটাকে তৈরি করে। তাই তো আহমদ ছফার গুরু বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, “বইয়ের দোকান পরখ করলেই বেবাক সমাজটা কোনদিকে যাইতাছে, হেইডা টের পাওন যায়।”

এঙ্গেলস ও মার্কস ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ লেখার ৭০ বছর পরে বাস্তবায়ন হয়েছে বলশেভিক বিপ্লব। এর মধ্যে নানাভাবেই এ চিন্তাকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা হয়েছে। ডিসেমব্রিস্ট থেকে নিহিলিস্ট, নারোদনিক থেকে সোশ্যাল রিভোল্যুশনারি—বারবার স্বপ্নকে জীবন দেওয়ার চেষ্টা শেষে বলশেভিকদের হাতে তা শেষ হয়েছে। একই ব্যাপার ঘটেছে সায়্যিদ কুতুবের লেখায়ও।

যখন সায়্যিদ কুতুব এসে ঘোষণা দিলেন, মুসলিম নামধারী শাসকও হতে পারে তাগুত, যে সমাজে আল্লাহর আইন গালেব নেই, সে সমাজ আছে জাহেলিয়ায়—এরপর নানাভাবে আল্লাহর আইন ফিরিয়ে আনার লড়াই হয়েছে। জামাআহ আল-ইসলামিয়াহ থেকে নিয়ে মুসলিম ব্রাদারহুড, কারিম আনাদুলু থেকে আব্দুল্লাহ আযযাম হয়ে তা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে আফগান, আফ্রিকা, সিরিয়ায়। যে লেখা অন্তর কেটে লেখা হয়, তা সহজে শুকায় না।

ঠিক এ কারণেই বইকে অনেক বেশি ভয় করে জালিমেরা। অনেক কিছু সহ্য করতে পারে তারা—কিন্তু বই না। সস্তা কালি ও কুড়িয়ে পাওয়া কাগজের প্রতি তাদের ভয় অনেক মিছিলের চেয়ে অনেক বেশি। তাই সায়্যিদ কুতুবের বই বের হওয়ার পরপরই নিষিদ্ধ করে দেয় মিশরের তৎকালীন তাগুত জামাল আব্দুল নাসের। ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ লেখার পরে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রুশো। নির্বাসনে থাকেন খোমেনি, লেনিন। জীবন দিতে হয় অনেককে।

বই দিয়ে বিপ্লব হয় না—সত্য। কিন্তু বই যদি বিপ্লবের ভিত না দাঁড় করায়, তবে বারবার গণবিস্ফোরণ হলেও কোনো সুন্দর, গোছানো ভবিষ্যতের দেখা মেলে না। বই-ই জন্ম দেয় মানুষ, আন্দোলন, বিপ্লব ও সভ্যতার। ঠিক এ কারণেই বইয়ের পেছনে শত শত ঘণ্টা ব্যয় করেছেন অনেক তাত্ত্বিক। আবার সেই বইকেই দমন করতে লাখ লাখ টাকা ও পুরো স্টেট মেকানিজমকে কাজে লাগিয়েছে জালিমেরা। আবার সেই বই-ই স্থান করে নিয়েছে গরিবের ভাঙা ঘরে, সতেজ অন্তরে।

তাই পড়ুন। লিখুন। স্বপ্ন দেখুন, স্বপ্ন লিখুন। অন্তর থেকে অন্তরে খোদিত করুন। আগুন জ্বালিয়ে দিন মানুষের অন্তরে। অস্ত্রের চেয়ে আইডিয়ার শক্তি বেশি—এ ধরনের যত উক্তি আছে, সবগুলোকে বিশ্বাস করুন। আগে কালি দিয়ে লিখুন, এরপরে রক্ত দিয়ে তাতে জীবন দিন। মুক্তি আসবেই, ইনশাআল্লাহ।

শেয়ার করুন: